বিবিধ

‘অপ্রতীম’ এর ঘটনায় কয়েকছত্র আলাপ

5 hours ago · 1 মিনিটে পড়ুন
arifazad.com

১.

সপ্তাহ দুই আগের ঘটনা। বাজার সদাই করে অটোতে করে ফিরছি। বড় বাজারটা বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে এবং যেতেও হয় মূল সড়ক ধরে।

সাধারণত রিক্সা বা অটোতে বসলে চেষ্টা করি ফোন যথাসম্ভব হাতে না রাখতে৷ তবে সেদিন জরুরি একটা ম্যাসেজের রিপ্লাই করার জন্য ফোনটা বের করি এবং সাবধানের সাথে টাইপও করছিলাম।

হঠাৎ পেছন থেকে সাঁ করে একটা বাইক এলো আর ছোঁ মারল আমার হাতে। আল্লাহর রহমতে, সাবধানতার সাথে ধরা ছিল বলে ফোনটা ছিনিয়ে নিতে পারেনি। যেহেতু বাইকে ছিল—দাঁত কিড়মিড় করে ওদের চলে যাওয়া দেখা ছাড়া আর কিছু করা গেল না।

বাইকের চালক আর যে ফোনটা কেড়ে নেওয়ার জন্য ছোঁ মারল, তাদের উভয়ের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। পেছনের জনের গায়ে ছিল সুন্দর পোলো শার্ট। বাইক আর তাদের বেশভূষা দেখে কেউ জীবনেও ভাববে না যে—এই ছেলেদুটো একটু আগে একজনের হাত থেকে ফোন ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছে।

২.

সোশ্যাল মিডিয়ার অবাধ ব্যবহার শুরু হওয়ার পর, বিশেষ করে ‘টিকটক’ আর ‘ফ্রি-ফায়ার’, ‘পাবজি’ জাতীয় গেইমগুলো আসার পর থেকে, দেশের বিশাল সংখ্যক কিশোরেরা এসবে বুঁদ হতে থাকে এবং এগুলোর সুবাদে সারাদেশের একটা বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সাথে তাদের পরিচিতি ঘটতে থাকে।
এর সাথে যোগ হয় অনলাইন বেটিং সাইটগুলোতে এদের পদচারণা।

টিকটক, পাবজি-ফ্রি ফায়ার, অনলাইন বেটিং সাইট—এই জিনিসগুলোর সুবাদে, আজ থেকে পাঁচ বা সাত বছর আগ থেকে সারাদেশে কিশোরগ্যাংয়ের একটা বড়সড় বিপ্লব ঘটে।

এই কিশোর গ্যাংদের অধিকাংশই গরিব বা দরিদ্রশ্রেণী থেকে উঠে আসা কেউ নয়। এদের পরিবার অবস্থাসম্পন্ন, সমাজে প্রতিপত্তিশীল, প্রভাবশালীও।

অভাবই যদি না থাকবে, তাহলে এরা কিশোরগ্যাংয়ের মাঝে বিলীন হয়ে পড়ে কেন?

মূল আলোচনাটা এখানেই।

এরা যে খাওয়ার কষ্ট থেকে, কিংবা পরার কষ্ট থেকে চুরি ছিনতাই করছে তা নয়। দুটো কারণে তারা এসবে জড়িয়ে পড়ে বলে আমি মনে করি।

(ক). টিকটক প্রোফাইলে শো-অফ করার জন্য বা তাদের খুবই মাস্তির জীবন এটা প্রদর্শনের জন্য যে ফিন্যান্সিয়াল সাপোর্ট দরকার, সেটা এই বয়সে পরিবার থেকে বের করে আনতে পারে না৷ কারণ, এদের অধিকাংশই পরিবারের সামনে সুবোধ বালক, ভাঁজা মাছটা উল্টে খেতে না জানা টাইপ ক্যারেক্টার সেজে থাকে। ফলে, বাড়তি মাস্তি ফ্যাশনের জন্য এবং অনলাইন বেটিং সাইটে জুয়া খেলায় দেদারসে উড়ানোর জন্য যে সাপোর্ট দরকার, সেটা জোগাড় করার জন্য তারা এই পথে পা বাড়ায়। নিজের এলাকায় না করে, কয়েকজন সংঘবদ্ধ হয়ে অন্য এলাকায় বা অন্য রোডে গিয়ে এসব করে সাধারণত।

(খ). ফ্রি-ফায়ার এবং পাবজি জাতীয় গেমগুলো সম্ভবত এমনভাবে ডেভেলপ করা যেখানে এই ধরণের অনেক ক্যারেক্টার হয়তো আছে যারা অনায়াসে কাউকে হ্যারেস করা, দুম করে মে রে ফেলা—এ জাতীয় কাজগুলো করে এবং এসবকে খুব মহান করে দেখানো হয়। যদিও আমি জানি না আদৌ এমনটা আছে কী না, তবে আমার ধারণা কিশোর গ্যাংয়ে ভিড়ে যাওয়ার একটা ভালো ইন্সপিরেশন তারা এসব গেমগুলো থেকে লাভ করে।

৩.

আমার এইসব আলাপের সাথে আপনারা অপ্রতীমের ঘটনাটার অনেক মিল খুঁজে পাবেন।

অপ্রতীমের ঘটনার মূল কালপ্রিট যে ছেলেটা, যাকে শুরুতেই গ্রেফতার করা হয়েছিল, তার মায়ের ইন্টারভিউটা অনেকেই দেখেছেন নিশ্চয়ই। তাদের ঘরদোর দেখে কি মনে হয়েছে যে—এই ছেলেটা স্রেফ অভাবের তাড়নায় এমন একটা ঘটনা ঘটিয়েছে?

অথবা, গ্রেফতার হওয়া বাকিদের প্রোফাইলও দেখেছেন নিশ্চয়ই? তাদের কাউকে কি হতদরিদ্র ঘরের, খেতে না পারা, পরতে না পারার কষ্টে আছে বলে মনে হয়েছে?
একদমই না৷ তারা সবাই অবস্থাসম্পন্ন, স্বচ্ছল পরিবারের ছেলেপিলে।

অথচ দেখেন, এইসব ঘরের ছেলেপিলেরা তাদের এতোদিনের বন্ধুকেই একটা সামান্য আইফোনের জন্য একেবারে শেষ করে দিতেও দ্বিধা করল না।

এই আইফোন ব্যবহারের রিস্ক তো তারা নিতোই না। নিশ্চিতভাবেই বিক্রি করে টাকা ভাগবাটোয়ারা করত। সেই টাকা দিয়ে তারা কী করত? ফ্রি ফায়ার, পাবজির মতো গেমগুলোর আরও প্রিমিয়াম ভার্সন কিনত? অনলাইন বেটিং সাইটে জুয়া খেলত? নেশা করত? সবটারই সম্ভাবনা আছে।

৪.

এই যে কিশোরগ্যাং তৈরি হলো দেশে, গ্রামেগঞ্জে, শহরে উপ-শহরে তারা ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ছে ব্যাঙের ছাতার মতো, এদেরকে কি রাতারাতি দমন করা সম্ভব?

হয়তো হ্যাঁ।
হয়তো না।

এই গ্যাংয়ের নেটওয়ার্কের সাথে খুব ক্লোজ কানেকশন থাকে উক্ত নির্দিষ্ট এলাকার প্রভাবশালী নেতাদের এবং থানার ওসিদের। নেতারা যে এলাকাতে খুবই পাওয়ার পলিটিক্সের প্র‍্যাকটিস করেন, এই পাওয়ারের অন্যতম একটা উৎস এখন এইসব কিশোর গ্যাং। তারা নেতাদের সামনে পেছনে হাঁটে, AURA যুক্ত সিগমা টিকটক ভিডিও বানিয়ে ছাড়ে। এতে তারা এই বার্তা দেয় যে—They have backings.

আর, এইসব কিশোরগ্যাংয়ের নেটওয়ার্ক যার নখদর্পনে থাকে, তিনি হলেন থানার ওসি। ওসির সাথে থাকে এদের গলায় গলায় ভাব। এদের উপার্জনের একটা অংশ খায় নেতা এবং তার লোকজন, একটা অংশ যায় ওসির পকেটে। ফলে, এদের বিরুদ্ধে যখন কোনো অভিযোগ দায়ের করতে আসে কেউ, ওসিরা মামলা নেয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই।

অপ্রতীমের বেলাতেও আমরা এই চিত্রটা দেখলাম না? অপ্রতীমের ঘটনাটা ভাইরাল হওয়ার পর মূল আসামিকে নিয়ে এক তরুণ প্রমাণাদি দিয়ে লিখেছিল যে—কিছুদিন আগে তাকে জিম্মি করে, তার বাইক ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল অপ্রতীম ঘটনার মূল হোতা ছেলেটা। কিন্তু পারেনি। সে সদর থানায় মামলা করতে গেলে ওসি বলেছিল, ‘মামলা নেওয়া যাবে না৷ বড়জোর জিডি করা যাবে। কারণ ওর মাথার উপরে এক বড় নেতার হাত আছে।’

ঠিক এই নেটওয়ার্কটার কথাই আমি বলেছি।

এখন সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই এই কিশোরগ্যাংয়ে সমূলে দমন করতে চায়, তাহলে এইসব নেতা আর ওসিদের নেটওয়ার্কটাকেও কল আউট করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

কিন্তু, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

৫.

সর্বশেষ যে কথাটা না বললেই নয়। দুয়া করি অপ্রতীমের সাথে যা ঘটেছে তা দুনিয়ার আর কারও সাথেই না ঘটুক।

তবে, অপ্রতীমের বাবা-মা তো অত্যন্ত শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষ। তাদের কেবল একটাই সন্তান। এই সন্তান এতো বাঁধনহারা হবে কেন? কেন বাবা-মা’র এইটুকু নজরদারি, শাসন-বারণ থাকবে না যে—তাদের ছেলে কার সাথে মিশছে, কার সাথে ঘুরছে, কার সাথে সময় কাটাচ্ছে তা একদম অগোচরে থেকে যাবে?

অপ্রতীমের টিকটক আইডির যে ভিডিও, ভিডিও’র ক্যাপশানগুলো সামনে এসেছে, একটা ১৩ বছরের ছেলের সাথে এইসব কোনোভাবে যায়?

এ কথা তো এখন নিঃসন্দেহ যে, অপ্রতীম যে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে শেষ হলো, সে নিজেও সেই দলটার একটা সদস্য ছিল।

সন্তান কার সাথে ঘুরাঘুরি করছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কাকে ফলো করছে, কী লিখছে—এইসব, অন্তত ১৩ বছরের একটা বাচ্চার বেলায় তো বাবা-মায়ের কঠোর নজরদারিতে থাকা অবশ্য কর্তব্য।

কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অপ্রতীমের বাবা-মা তা করতে পারেননি। তাদের সন্তান যে মনস্টার গ্রুপটাকে এলাকার ‘ভাই-ব্রাদার’ বানিয়েছিল, যাদের সাথে সিগমা ভিডিও বানাতো নিয়মিত, যাদের বাইকের পেছনে শার্টের বোতাম খুলে দিয়ে ঘুরে বেড়াত, তাদের হাতেই নির্মমভাবে নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ।

Parenting isn’t just about providing food, clothes, education, and everything else a child needs. Sometimes, parenting is about setting boundaries and taking control.

অপ্রতীমের বাবা-মা অপ্রতীমের জন্য কোনো বাউন্ডারি সেট করেননি। তাকে কন্ট্রোলও করতে চাননি হয়তো।